Home / খুলনা / উপকূল উপাখ্যান; কি দেখেছি আর কি দেখছি

উপকূল উপাখ্যান; কি দেখেছি আর কি দেখছি

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের সমুদ্র উপকূলবর্তী এক জনপদ পাইকগাছা-কয়রা। দেশের এই অঞ্চলটি সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি চাষের জন্য বিখ্যাত এবং এই করণে এই অঞ্চলটি কুয়েত সিটি হিসাবে দেশে প্রসিদ্ধ। আজ এই অঞ্চলের মানুষের বদলে যাওয়া উপাখ্যান শোনাবো। জানাবো কেমন করে অতিদ্রুত পাল্টে গেছে এই জনপদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন মান।
আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১০ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে উন্নয়নের মহা কর্মযজ্ঞ চলছে। তার সম্পূর্ণ উত্তাপ এই জনপদে না লাগলেও পিছিয়ে নেই এই এলাকার মানুষ। বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে সুন্দরবনের নিবিড় ছোয়াঁয় গড়ে ওঠা এই জনপদের মানুষ আজ অনেকটা এগিয়ে গেছে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে।
কি দেখেছি আর কি দেখছি??? পার্থক্য করাটা খুবই সহজ। কারণ ঠান্ডা মাথায় চোখ বন্ধ করুন তারপর ভালোভাবে মনের চক্ষু দিয়ে দেখুন। মনের আয়নায় দেখার চেষ্টা করুন ১০ বছর আগে আপানার জনপদের চারপাশ। যেখানে আপনার বেড়ে ওঠা, যেখানে আপনি কাটিয়েছেন আপনার শৈশব, কৈশোর এমনকি এখনো আপনি সেখানেই আছেন। কি, নিশ্চয় ১০ বছর আগের আর আজকের মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখতে পাচ্ছেন আপনার চারপাশে।
আর যদি না পান তাহলে সমস্যা নাই কারণ অনেকে এই পরিবর্তন দেখেও দেখবেন না, আবার স্বীকার করতেও চাইবেন না এটাই স্বাভাবিক। তাই আপনাদের জন্য রাতের ঘুম নষ্ট করে, কষ্ট করে আমার এই উপাখ্যান।

যাক ভূমিকা বাদ দিয়ে মূল উপাখ্যানে আসি। কথায় আছে “আগে বাড়ির বড়দা (বড় দাদা) তারপর বাইরের বড়দা”। তাই নিজ জন্মস্থান, নিজ এলাকার পরিবর্তন গুলো আগেই তুলে ধরছি। হয়তো ভুলে গেছেন কিংবা জীবন মানের এই পরিবর্তনের হিসাব আপনি কোনদিন করেননি। এখান থেকে ১০/১২ বছর পিছনে ফিরে যাবো যখন আমরা প্রথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। তখন বিদ্যালয় গুলোতে জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝিতে স্কুলে নতুন ক্লাসের বই দেওয়া হতো। নতুন ক্লাসের বই হিসাবে শিক্ষার্থীদের দেওয়া হতো ২/৩ টা নতুন বই। আর বাকি বই গুলো দেওয়া হতো বিগতো বছরের পুরাতন বই। এবং বই দেওয়ার সময় বিদ্যালয় হতে শিক্ষকদের নির্দেশনা থাকতো বই গুলোতে কোন রকম দাগ দেওয়া যাবেনা, কাটা ছেঁড়া করা যাবেনা। করণ বছর শেষে এই বই গুলো শিক্ষকেরা জমা নিতেন এবং সেটা আবার নতুন বছরে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করতেন। কিন্তু আজ কি হয়? বছরের প্রথম দিনে(১ জানুয়ারি) সরকার বই উৎসব করে আপনার আমার সন্তান, ছোট-ভাই বোনদের হাতে তুলে দিচ্ছে এক সেট নতুন বই। সেই সময়ে দেখেছি শিক্ষার্থীদের মাসে ৫০ টাকা করে উপবৃত্তি দেওয়া হতো। এবং সেই উপবৃত্তির টাকা সংগ্রহের জন্য আমাদের মা চাচিরা ১০/১৫ কিলো পথ অতিক্রম করে উপজেলা সদরে যেতো। কিন্তু আজ, শিক্ষার্থীদের মায়ের নিজস্ব মোবাইল একাউন্টে মাস প্রতি আগের চেয়ে ৪/৫ গুন বেশি টাকা এককালীন উপবৃত্তি হিসাবে চলে আসে।
এখান থেকে ১০/১২ বছর আগে কোথাও ১০০ লোক জমা হলে তার মধ্যে ১০/২০ জন লোক পাওয়া যেতো যারা খালি গায়ে অথবা খালি পায়ে আছে।আর এখন কোথাও ১০০০ লোক সমবেত হলে ৫/১০ এমন খালি গায়ে,খালি পায়ের লোক পাওয়া দুষ্কর। গ্রামের অধিকাংশ বৃদ্ধ চাচা, দাদাদের দেখেছি খালি গায়ে অথবা একটা গামছা নিয়ে খালি পায়ে রাস্তার চলতে,বাজারে যেতে। কিন্তু আজ আর এগুলো দেখা যায়না।
আরো দেখেছি মা,চাচি,দাদিদের গোসলের সময় কেমন আটুলি কাদা(এঁটেল মাটির কাদা) দিয়ে মাথার চুল পরিস্কার করতে। অথবা কপাল ভালো হলে কাপড় ধোঁয়া পচা বল সাবান দিয়ে মাথার চুল পরিস্কার করতে। আর গায়ে মাখা সুগন্ধি সাবান সেতো বছরের দুই ঈদে। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর দাঁত পরিস্কারের জন্য ব্যবহার করতো নিম গাছের ডাল অথবা চুলার ছাই-কয়ল। কিন্তু আজ কে দাদি, কে চাচি আবাল বৃদ্ধ বণিতা সবাই মাথার চুল পরিস্কারের জন্য শ্যাম্পু না হলে চলেই না তা আবার সপ্তাহে ২/৩ দিন। এবং সকালের দাঁত পরিস্কার করেন টুথপেস্ট দিয়ে।

আসুন এবার আমার বাড়ির পাশ দিয়ে চলাচলের রাস্তার কথা মনে করিয়ে দেই। মনে পড়ে ১০/১২ বছর আগে কাঁটাখালি হতে বাঁকা বাজার ,বাঁকা বাজার হতে বয়লিয়া ঘাটের রাস্তার কথা। আলমতলা হতে গোড়োইখালীর রাস্তার কথা। চাঁদখালী হতে মৌখালী এবং গজালিয়ার রাস্তার কথা। এমন লোক তখন পাওয়াই যেতো না যে ঐ রাস্তা দিয়ে চলাচলের সময় এলাকার জনপ্রতিনিধির গুষ্ঠি উদ্ধার করেনি। হ্যাঁ আপনি, আমিও তখন ঐ রাস্তা দিয়ে চলার সময় একই কাজ করেছি। ১০/১২ বছর আগে নিজ বাড়ি হতে যে কোনো প্রয়োজনে উপজেলা সদরে যেতে কম করে হলেও ১ ঘণ্টা সময় লাগতো। আর এখন খুব সহজেই ১০ মিনিটে উপজেলা সদরে যাওয়া যায়। নিজ এলাকার চারিপাশের রাস্তাগুলো দেখুন। শিববাড়ি, বয়লিয়া,বড়দালের ব্রিজ গুলো দেখুন। ভাবুনতো এই ব্রিজগুলো হওয়ার আগে আমাদের কষ্টের কথা। কি ভুলে গেছেন? যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নের ফলে আপনার বাড়ির আশেপাশের স্থানীয় বাজার গুলোতে প্রতি সপ্তাহে দেখা মেলে শহরের নাম করা ডাক্তারদের। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো আপনাকে দিচ্ছে ফ্রী চিকিৎসা ও ঔষধ। যদিও অনেক গ্রামবাসি এই সেবা সম্পর্কে খুব বেশি অবগত নয়।

আমরা ছোট বেলায় পড়ালেখা করেছি হারিকেন,ল্যাম্পের আলোতে অসহনীয় গরমের মধ্যে। অথচ এখন ভালো করে চেয়ে দেখুন আপনার চারিপাশে ৯০% পরিবার বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে। বাড়ি বসে আজ স্যাটেলাইটের(ডিস টিভি) মাধ্যেমে দেশের সব প্রান্তের খবর রাখছেন। ঠিক এখান থেকে ১০ বছর আগে মোবাইলে রিং আসলে ঘর থেকে বের হয়ে ফাঁকা অথবা উঁচু জায়গা খুঁজতেন, বাড়ির সিঁড়ির পরে উঠে হ্যালো,হ্যালো করে গলা ফাটাতেন,কারণ নেটওয়ার্ক সমস্যা। অথচ সেই একই জায়গা হতে আজ আপনার আমার সন্তানেরা, ছোট-ভাই বোনেরা থ্রিজি চালায়, ফেসবুক চালায়, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বের খবর রাখে। গতবছর ৬/৭ মাস পরে যখন এলাকাতে যাই, দেখি ইন্টারনেট লাইনের জন্য এলাকাতে সাবমেরিনের ক্যাবল বসানো হচ্ছে। আজ আপনার সন্তানের চাকরির আবেদনের জন্য পোস্ট অফিসে কিংবা থানা সদরে যাওয়া লাগে না। বাড়ির পাশে মোড়ে কিংবা স্থানীয় বাজারে বসেই খুব সহজে সেটা করতে পারছে। এছাড়া ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্র হতে স্বাস্থ্য সেবা,কৃষি সেবা সহ ডিজিটাল বাংলাদেশের বহু সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এলাকার বাজার, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে শহরের মতো সোলারের সড়ক বাতি। এমন কি এই বাতির কল্যাণে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত বাজার জমজমাট চলছে। মড়ে মড়ে চায়ের দোকান, দোকান গুলোতে ফ্রিজ, ডিস লাইন(স্যাটেলাইট), ঠিক যেন গ্রাম্য আবহের এক শহুরে পরিবেশ।
হ্যাঁ আগে দেখেছি গুরুর মাংসের দাম ১০০ টাকা কেজি কিন্ত ৭০ হতে ৮০ ভাগ মানুষের কপালে সেটা জুটতো শুধু কুরবানীর ঈদে। অথচ আজ ৪৫০ টাক কেজি হলেও ৭০ থেকে ৮০ ভাগ লোক বছরে দুই-দশ বার সেটা খেয়ে থাকে। এমন কি বাড়িতে মেহমান এলে, আর সেটা যদি হয় শশুর বাড়ি,বেয়াই বাড়ির কেউ এলে খাবারের মেনুতে গরুর মাংস না হলে কেমন যেন আত্মসম্মান থাকে না। এমন কি খাওয়ার শেষে ফ্রিজের ঠাণ্ডা দধি ও কোক অপরিহার্য।

আগে মানুষ দিনে আনতো, দিনে খেতো। খুবই কম সংখ্যক মানুষের কাছে নগদ অর্থ বা সম্পদ ছিলো। কিন্তু আজ গ্রামের অধিকাংশ পরিবারের কর্তাদের কাছে কিছু পরিমাণ হলেও নগদ অর্থ আছে হোক সেটা ব্যাংকে অথবা অন্য কোনো সেক্টরে। আপনারা নিশ্চয় ভুলে যাননি যে ১০/১২ বছর আগে প্রতিদিন দেখতাম সারাদিন বাড়িতে ২/৫ জন ভিখারী আসতো এমন কি শক্রবারে সারাদিনে আরো বহু ভিখারীর দেখা মিলতো। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে বাড়িতে গিয়ে যখন কয়েকদিন থাকি তখন কিন্ত একটা ভিখারীকে বাড়ি আসতে দেখিনা। এটার কারণ সরকার প্রদত্ত বৃদ্ধ ভাতা, বিধবা ভাতা।

আচ্ছা এবার বলুনতো মনে পড়ে কি ২০০৪ সালে একবার ভাত খেতে গেলে ভাত যেনো কেমন তিতা মনে হতো। কারণ কি জানেন ঐ সময় সেচের পানি ও সারের অভাবে দেশের অধিকাংশ এলাকার ধান উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ধানে চিটা ধরে যায়। আর নিশ্চয় ঐ সময়ে ধান বা ফসল চাষাবাদের প্রয়োজনীয় সার, কীটনাশকের জন্য এলাকার মেম্বার, চেয়ারম্যানের কাছে ধর্না দেওয়ার কথা ভুলে যাননি। এলাকার চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে ধর্না দিয়ে জমির পরিমাণ অনুযায়ী প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য সার বা কীটনাশক পেতেন।
আর এখন? আর এখন, আপনি মিলিয়ে দেখুন সেই সময় আর এই সময়ের পার্থক্য। কি দেখেছেন আর কি দেখছেন? নিশ্চয়ই পরিবর্তন এবং এই উন্নয়নের ধারা আপনার চোখে ধরা পড়বে। চোখে পড়বে বদলে যাওয়া মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবন মান।বিগত দশ বছরে মানুষের সামাজি ও অর্থনৈতিক জীবন মানের এই পরিবর্তন শুধু আমার নিজ এলাকায় না,দেশের সব এলাকতে ঘটেছে।

হাফিজুল ইসলাম হাফিজ
বিএসএস(অনার্স),এমএসএস ( রাষ্ট্রবিজ্ঞান),ঢাবি।

About বাংলার নিউজ ডেস্ক

Check Also

লায়ন মতিউর রহমান টিপুর দিক নির্দেশনায় পারভেজ খানের নেতৃত্বে আজ ঈদের দিনে দুঃখী মানুষের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ

সজীব ওয়াজেদ জয় পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক সজীব ওয়াজেদ জয় পরিষদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবনিযুক্ত …

১৩নং গুটুদিয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের পরিশ্রমী ছাত্রনেতা মিজানুর রহমান সানার নেতৃত্বে বৃক্ষ রোপন কর্মসূচী।

আক্তারুল আলম সুমন-খুলনা ব্যুরো প্রধান: মুজিব শতবর্ষে আহবান ৩ টি করে গাছ লাগান। ১৩ নং …

মান্দায় বন্যা কবলিত অঞ্চল পরিদর্শন করলেন বিএনপির নেতা মকলেছুর রহমান

শাহাদৎ রাজীন সাগর, স্টাফ রিপোটারঃ নওগাঁর মান্দায় ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে ধেয়ে আসা পানির …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *